এখানে আপনার পণ্য বা সেবার বিজ্ঞাপন দিন।

ঢাকা ০৩ ডিসেম্বর ২০২১ শুক্রবার

ব্রেকিং

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি: বাংলাদেশর সকল জেলায় জেলা প্রতিনিধি, উপজেলা প্রতিনিধি, বিশেষ প্রতিনিধি ও বিজ্ঞাপন প্রতিনিধি পদে জরুরী ভিত্তিতে সাংবাদিক নিয়োগ চলছে। আগ্রহী প্রার্থীগণ নিউজ সাইটের যোগাযোগ অংশে প্রদত্ত ঠিকানায় (ফোন, ইমেইল) যোগাযোগ করুন।

বদিউল আলম, উলিপুর প্রতিনিধিঃ

প্রকাশিত: ২২ নভেম্বর ২০২১, ২৩:০০

আপডেট: ২২ নভেম্বর ২০২১, ২৩:০০

৫৬

শেয়ার:

কুরআন ও হাদীসের আলোকে প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য

মানুষ সামাজিক জীব। সমাজ বা দলবদ্ধ হয়ে পরস্পরে মিলেমিশে বসবাস করতে হয়। একাকী বসবাস করতে পারেনা। আর ‘যারা আমাদের আশে পাশে বসবাস করে তারাই আমাদের প্রতিবেশী’।

News

সমাজে বাস করতে হলে এক মানুষের সঙ্গে অপর মানুষের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক জরুরি। ইসলামে এ জন্য প্রতিবেশীর সঙ্গে সু-সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।  পাড়া-প্রতিবেশীর সঙ্গে সদাচরণের যে বাধ্যবাধকতা ইসলামে আরোপ করা হয়েছে তা দৃষ্টান্তস্থানীয়।

রসুল (সা.) - এর কাছে এসে এক ব্যক্তি বলল- কি আমল অনুসরণ করলে বেহেশতে যাওয়া যাবে তা যেন তিনি বাতলে দেন। রসুল (সা.) বললেন পরোপকারী হও। ওই ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, কীভাবে বুঝব আমি পরোপকারী? রসুল (সা.) বললেন, "তোমার প্রতিবেশী যদি বলে তুমি পরোপকারী, তবে তুমি পরোপকারী। আর যদি সে বলে তুমি অন্যায়কারী তবে তুমি অন্যায়কারী।"


কুরআন মজীদ ও সহীহ হাদীসের আলোকে ইসলামের দৃষ্টিতে প্রতিবেশীর হক 


প্রতিবেশীর হক কুরআনে:


আল্লাহতাআলা আলকুরআনুল কারীমে সূরা নিসার ৩৬ নং আয়াতে আল্লাহর ইবাদাত ও তার সাথে কাউকে শরিক না করা-এই বিধানের সাথে উল্লেখ করেছেন বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের হক। তার মধ্যে রয়েছে মাতা পিতার হক, আত্মীয় স্বজনের হক, এতীমের হক ইত্যাদি। এসব গুরুত্বপূর্ণ হকের সাথেই আল্লাহ প্রতিবেশীর হককে উল্লেখ করেছেন। এ থেকেই বোঝা যায়, প্রতিবেশীর হককে আল্লাহ কত গুরুত্ব দিয়েছেন এবং তা রক্ষা করা আমাদের জন্য কতজরুরি।  আল্লাহ বলেন,

وَٱعْبُدُوا۟ ٱللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا۟ بِهِۦ شَيْـًٔا وَبِٱلْوَٰلِدَيْنِ إِحْسَٰنًا وَبِذِى ٱلْقُرْبَىٰ وَٱلْيَتَٰمَىٰ وَٱلْمَسَٰكِينِ وَٱلْجَارِ ذِى ٱلْقُرْبَىٰ وَٱلْجَارِ ٱلْجُنُبِ وَٱلصَّاحِبِ بِٱلْجَنۢبِ وَٱبْنِ ٱلسَّبِيلِ وَمَا مَلَكَتْ أَيْمَٰنُكُمْ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يُحِبُّ مَن كَانَ مُخْتَالًا فَخُورًا



আর উপাসনা কর আল্লাহর, শরীক করো না তাঁর সাথে অপর কাউকে। পিতা-মাতার সাথে সৎ ও সদয় ব্যবহার কর এবং নিকটাত্নীয়, এতীম-মিসকীন, প্রতিবেশী, অসহায় মুসাফির এবং নিজের দাস-দাসীর প্রতিও। নিশ্চয়ই আল্লাহ পছন্দ করেন না দাম্ভিক-গর্বিতজনকে।(সূরা নিসাঃ৩৬)


উত্তম প্রতিবেশী কে?


এ প্রশ্নের সহজ উত্তর হল, যে প্রতিবেশীর সাথে ভালো আচরণ করে এবং প্রতিবেশীর সকল হক যথাযথভাবে আদায় করে। ফলে প্রতিবেশী তার উপর সন্তুষ্ট থাকে এবং আল্লাহ্ও তারউপর সন্তুষ্ট থাকেন। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আম্র রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসাল্লাম বলেছেন, ... যে স্বীয় প্রতিবেশীর দৃষ্টিতে ভালো সেই সর্বোত্তম প্রতিবেশী। (সহীহইবনে খুযাইমা হা. ২৫৩৯; শুআবুল ঈমান বায়হাকী, হা. ৯৫৪১; মুসনাদে আহমদ হা. ৬৫৬৬)


প্রতিবেশীর খোঁজ খবর রাখা ঈমানের দাবি


হযরত ইবনে আববাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ঐ ব্যক্তি মুমিন নয় যে পেট পুরে খায় অথচ তার পাশের প্রতিবেশী না খেয়ে থাকে। (মুসনাদেআবু ইয়ালা, হাদীস ২৬৯৯; আল আদাবুল মুফরাদ, হাদীস ১১২)


এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়, অনেক প্রতিবেশীই এমন আছে, যাদের দেখে বোঝার উপায়নেই যে, তারা অভাবে দিন কাটাচ্ছে। আবার আমার কাছে কখনো চাইবেও না। কুরআন মাজীদে এদেরকে ‘মাহরূম’ বলা হয়েছে, 

সূরাঃ আয-যারিয়াত 


وَفِىٓ أَمْوَٰلِهِمْ حَقٌّ لِّلسَّآئِلِ وَٱلْمَحْرُومِ


এবং তাদের ধন-সম্পদে প্রার্থী ও বঞ্চিতের হক ছিল।


এক্ষেত্রে আমাদের কর্তব্য, নিজে থেকে তাদের খোঁজ খবর রাখা এবং দেওয়ার ক্ষেত্রে এমন পন্থা অবলম্বন করা, যাতে সে লজ্জা না পায়। এজন্যইতো যাকাত দেওয়ার ক্ষেত্রে এটা বলে দেয়াজরুরি নয় যে, আমি তোমাকে যাকাত দিচ্ছি; বরং ব্যক্তি যাকাতের যোগ্য কি না এটুকু জেনে নেয়াই যথেষ্ট। আর আমি যদি প্রতিবেশীর প্রয়োজন পুরা করব তাহলে আল্লাহ আমার প্রয়োজন মিটিয়ে দিবেন এবং আমার সহায় হবেন। হাদীস শরীফে এসেছে, যে তার ভাইয়ের প্রয়োজন পুরা করে আল্লাহ তার প্রয়োজন পুরা করেন। (সহীহ বুখারী, হাদীস ২৪৪২; সহীহ মুসলিম, হাদীস২৫৮০)



প্রতিবেশীর সাথে সদাচরণ:


প্রতিবেশী আমার জীবনের আবশ্যকীয় অনুষঙ্গ। তার সাথে আমার আচরণ সুন্দর হবে তা কিবলে বোঝাতে হয়? আর আমি যদি মুমিন হই তাহলে তো তা আমার ঈমানের দাবি। হযরত আবু শুরাইহ্ রা. বলেন, আমার দুই কান শ্রবণ করেছে এবং আমার দুই চক্ষু প্রত্যক্ষ করেছে যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যে আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখে এবংআখেরাতে বিশ্বাস রাখে সে যেন স্বীয় প্রতিবেশীকে সম্মান করে। সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় আছে ‘সে যেন স্বীয় প্রতিবেশীর সাথে সদাচরণ করে।’ (সহীহ বুখারী, হাদীস ৬০১৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস ৪৮)



প্রতিবেশী রোগীর সেবা করাও ইবাদত:


পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুবান্ধবের মধ্যে কেউ যদি অসুস্থ হয়ে পড়ে, তাকে দেখতে যাওয়া ও তার অবস্থা জিজ্ঞেস করা মুস্তাহাব। যদি রুগ্ণ ব্যক্তির দেখাশোনা করার মতো তার কোনো আত্মীয়স্বজন না থাকে, তাহলে সর্বসাধারণের মধ্যে তার সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ব্যক্তিদের ওপর তার সেবাশুশ্রুষা করা ফরজেকেফায়া।


রাসূলুল্লাহ সা: ইরশাদ করেন, এক মুসলমানের ওপর অপর মুসলমানের হক পাঁচটি -


১। সালামের জবাব দেয়া,  ২। রোগীকে দেখতে যাওয়া, ৩। জানাজায় শরিক হওয়া,


৪। দাওয়াত কবুল করা, ৫। হাঁচির জবাব দেয়া। (বুখারি, মুসলিম ও মিশকাত শরিফ : হাদিস নম্বর ১৫২৪)।


হজরত বারা ইবনে আজিব রা: বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: আমাদের সাতটি কাজের নির্দেশ দিয়েছেন -

প্রথম, রোগীর শুশ্রুষা করা। দ্বিতীয়, জানাজার পশ্চাতে চলা। তৃতীয়, হাঁচিদাতার জবাবে ‘ইয়ারহামুকাল্লাহ’ বলা। চতুর্থ, দুর্বল মানুষের সাহায্য করা। পঞ্চম, নিপীড়িত ব্যক্তিদের সাহায্য করা; ষষ্ঠ, সালামের প্রচার-প্রসার ঘটানো। সপ্তম, কসমকারীর কসমকে পুরা করতে সাহায্য করা (বুখারি শরিফ ৭/১১৩ : হাদিস নম্বর ৫৬৩৫)।



সর্বপ্রথম রাসূল সা: যা বলেছেন তা হচ্ছে, রোগীর সেবাযত্ন করা। অসুস্থ ব্যক্তির অসুস্থতার কথা জিজ্ঞেস করা। রাসূলুল্লাহ সা: নিজেও রোগীর সেবাশুশ্রুষা করতেন। হাদিস শরিফে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সা: এক অসুস্থ ইহুদি গোলামকে দেখতে গিয়ে তাকে ইসলামের দাওয়াত দিলে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন।


হাদিয়া আদান-প্রদান:


প্রতিবেশীদের পরস্পরের সুসম্পর্ক বৃদ্ধির ক্ষেত্রে হাদিয়ার আদান-প্রদান খুবই কার্যকর পন্থা। এর মাধ্যমে হৃদ্যতা সৃষ্টি হয় ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন মজবুত হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা হাদিয়া আদান-প্রদান কর। এর মাধ্যমে তোমাদের মাঝে হৃদ্যতা সৃষ্টি হবে।’ (দ্র. আল আদাবুল মুফরাদ,বুখারী হাদীস : ৫৯৪)


এক প্রতিবেশী আরেক প্রতিবেশীকে হাদিয়া দেওয়ার বিষয়টি এত গুরুত্বপূর্ণ যে, সামান্য জিনিস হাদিয়া দিতেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের উদ্বুদ্ধ করেছেন। এক হাদীসে আছে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আবু যর রা.- কেবলেন, হে আবু যর, তুমি ঝোল (তরকারি) রান্না করলে তার ঝোল বাড়িয়ে দিও এবং তোমার প্রতিবেশীকে তাতে শরিক করো। (সহীহ মুসলিম,হাদীস ২৬২৫)


অন্য হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীদেরকে এ বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করেবলেছেন, হে মুসলিম নারীগণ! তোমাদের কেউ যেন প্রতিবেশীকে হাদিয়া দিতে সংকোচবোধনা করে। যদিও তা বকরীর খুরের মত একটি নগন্য বস্ত্তও হয়। (দ্র. সহীহ বুখারী ৬০১৭)



সুতরাং প্রতিবেশী নারীরাও নিজেদের মাঝে হাদিয়া আদান-প্রদান করবেন।


প্রতিবেশী যদি দরিদ্র হয়:


আর প্রতিবেশী যদি দরিদ্র হয় তাহলে এ বিষয়ে তার হক আরো বেশি। কারণ দরিদ্রকে খানা খাওয়ানো যেমন অনেক সওয়াবের কাজ তেমনি দরিদ্রকে খানা না-খাওয়ানো জাহান্নামে যাওয়ার একটি বড় কারণ। কুরআন মজীদে ‘ছাকার’ নামক জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হিসেবে নামায না পড়ার বিষয়টির সাথে সাথে দরিদ্রকে খানা না খাওয়ানোও গুরুত্ব সহকারে উল্লেখিত হয়েছে। কুরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে, (জাহান্নামীকে জিজ্ঞেস করা হবে)  (সূরা মুদ্দাছ্ছির ৪২-৪৪)


مَا سَلَكَكُمْ فِى سَقَر

বলবেঃ তোমাদেরকে কিসে জাহান্নামে নীত করেছে?

قَالُوا۟ لَمْ نَكُ مِنَ ٱلْمُصَلِّ

তারা বলবেঃ আমরা নামায পড়তাম না,

وَلَمْ نَكُ نُطْعِمُ ٱلْمِسْكِينَ

অভাবগ্রস্তকে আহার্য্য দিতাম না,



নিকটতম প্রতিবেশীকে আগে হাদিয়া দিব, যদিও সে বিধর্মী হয়


প্রতিবেশীর মধ্যে যেমন আছে নিকট প্রতিবেশী, নিকটতম প্রতিবেশী ও তুলনামূলক একটুদূরের প্রতিবেশী তেমনি আছে মুসলিম ও বিধর্মী। এখন কাকে হাদিয়া দিব বা কাকে আগে দিব? হযরত আয়েশা রা. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলাম - আমার দুই প্রতিবেশী। এদের কাকে হাদিয়া দিব? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসাল্লাম বললেন, যে তোমার বেশি নিকটবর্তী। (সহীহ বুখারী, হাদীস ৬০২০)



মুজাহিদ রহ. বলেন, একবার আমি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আম্র রা.-এর কাছে ছিলাম। তার গোলাম একটি বকরীর চামড়া ছাড়াচ্ছিল। তখন তিনি বললেন, তোমার এ কাজ শেষ হলে সর্বপ্রথম আমাদের ইহুদী প্রতিবেশীকে দিবে। তখন এক ব্যক্তি বলল, আল্লাহ আপনার এসলাহকরুন। আপনি ইহুদীকে আগে দিতে বলছেন! তখন তিনি বললেন, (হাঁ) আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রতিবেশীর হকের বিষয়টি এত বেশি গুরুত্ব দিয়ে বলতে শুনেছি যে, আমাদের আশংকা হয়েছে বা মনে হয়েছে, প্রতিবেশীকে মিরাছের হকদার বানিয়েদেয়া হবে। (আল আদাবুল মুফরাদ, বুখারী,হাদীস ১২৮; শরহু মুশকিলিল আছার, তহাবী,হাদীস ২৭৯২)



প্রতিবেশীর প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিব:


অনেক সময় এমন হয়, প্রতিবেশীর প্রয়োজনে কিছু ছাড় দিতে হয়। কিংবা নিজের কিছু ক্ষতি স্বীকার করলে প্রতিবেশীর অনেক বড় উপকার হয় বা সে অনেক বড় সমস্যা থেকে বেঁচে যায়। তেমনি একটি বিষয় হাদীস শরীফে উদ্ধৃত হয়েছে, যা মুমিনকে এ বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কোনো প্রতিবেশী যেন অপর প্রতিবেশীকে তার দেয়ালে কাঠ স্থাপন করতে বাধা না দেয়। (সহীহ বুখারী,হাদীস ২৪৬৩; সহীহ মুসলিম,হাদীস ১৬০৯) আরেক হাদীসে এসেছে, যে তার (মুসলিম) ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণ করে স্বয়ং আল্লাহ তারপ্রয়োজন পুরা করেন। (সহীহ মুসলিম,হাদীস ২৫৮০)


নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস আদান প্রদান:


আমাদের প্রায় সকলেরই সূরা মাউন মুখস্থ আছে। ‘মাউন’ অর্থ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস দৈনন্দিন জীবনে আমাদের ছোট খাট অনেক জিনিসেরই প্রয়োজন হয়। কোনো বস্ত্তহয়তো সামান্য, কিন্তু তার প্রয়োজন নিত্য। যেমন লবন। খুবই সামান্য জিনিস, কিন্তু তা ছাড়া আমাদের চলে না। কখনও এমনও হয় দশ টাকার লবন কেনার জন্য বিশ টাকা রিক্সা ভাড়া খরচ করতে হবে বা এখন এমন সময় যে তা পাওয়া যাবে না। অথচ লবন না হলে চলবেই না। তখন আমরা পাশের বাড়ি বা প্রতিবেশীর দ্বারস্থ হই। এমন সময় এ সাধারণ বস্ত্তটি যদি কেউ না দেয় তাহলে নিশ্চয়ই অনেক কষ্ট হয়ে যাবে। কোনো প্রতিবেশী যদি এমন হয় তাহলে তাকে ধিক শত ধিক।

আল্লাহও তাকে ভৎর্সনা দিয়েছেন। সূরা মাউনে আল্লাহ বলেছেন,  (সূরা মাউন: ৪-৭)


فَوَيْلٌ لِّلْمُصَلِّينَ

অতএব দুর্ভোগ সেসব নামাযীর,

ٱلَّذِينَ هُمْ عَن صَلَاتِهِمْ سَاهُونَ

যারা তাদের নামায সম্বন্ধে বে-খবর;

ٱلَّذِينَ هُمْ يُرَآءُونَ

যারা তা লোক-দেখানোর জন্য করে

وَيَمْنَعُونَ ٱلْمَاعُونَ

এবং নিত্য ব্যবহার্য্য বস্তু অন্যকে দেয় না।

প্রতিবেশী কষ্ট দিলে কী করব?


হতে পারে আমার প্রতিবেশী আমাকে কষ্ট দেয় তাই বলে কি আমিও প্রতিবেশীকে কষ্ট দিব? তা হতে পারে না। মুমিন তো সর্বদা ভালো আচরণ করে। মুমিনের গুণ তো

أحسن إلى من أساء إليك

তোমার সাথে যে মন্দ আচরণ করে তুমি তার সাথে ভালো আচরণ কর।’ সে তো কুরআনের ঐ আয়াত শুনেছে

ولمن صبر وغفر إن ذلك لمن عزم الأمور.

প্রকৃত পক্ষে যে সবর অবলম্বন করে ও ক্ষমা প্রদর্শন করে, তো এটা বড় হিম্মতের কাজ। (সূরাশূরা : ৪৩)


হাদীস শরীফে এসেছে, আল্লাহ তিন ব্যক্তিকে পছন্দ করেন, তাদের একজন ঐব্যক্তি, যার একজন মন্দ প্রতিবেশী রয়েছে, সে তাকে কষ্ট দেয়। তখন ঐ ব্যক্তি ছবর করে এবং আল্লাহর ছাওয়াবের আশা রাখে। এক পর্যায়ে ঐ প্রতিবেশীর ইন্তেকাল বা চলে যাওয়ার মাধ্যমে আল্লাহ তাকে মুক্তি দেন। (মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২১৩৪০; আলমুসতাদরাক, হাকেম খ. ২পৃ. ৮৯; শুআবুল ঈমান, বায়হাকী, হাদীস ৯১০২)


জমির আইল ঠেলা:

অনেক সময় এমন হয় যে দুই প্রতিবেশী তাদের বাড়ির সীমানা নিয়ে বিবাদে জড়িয়ে পড়ে। যে প্রতিবেশীর শক্তি বেশি সে জোরপূর্বক নিজের সীমানা বাড়িয়ে নেয়। এটা বসত বাড়ির ক্ষেত্রে যেমন হয় ফসলের জমির প্রতিবেশীর সাথে আরো বেশি হয়। যাকে বলে ‘আইলঠেলা’। সামান্য যমিন ঠেলে সে নিজের ঘাড়ে জাহান্নাম টেনে আনল। যতটুকু যমিন সে জবরদস্তি বাড়িয়ে নিল সে নিজেকে তার চেয়ে সাতগুণ বেশি জাহান্নামের দিকে ঠেলে নিল। হাদীস শরীফে এসেছে, যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে এক বিঘত জমি দখল করল, কিয়ামতের দিন ঐ জমির সাত তবক পরিমাণ তার গলায় বেড়ি আকারে পরিয়ে দেয়া হবে। (সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৬১১)


প্রতিবেশীর দোষ ঢেকে রাখব:

পাশাপাশি থাকার কারণে একে আপরের ভালো মন্দ কিছু জানাজানি হয়ই। গোপন করতে চাইলেও অনেক কিছু গোপন করা যায় না। প্রতিবেশীর এসকল বিষয় পরস্পরের জন্য আমানত।

নিজের দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণেই একে অপরের দোষ ঢেকে রাখা জরুরি। আমি যদি তার দোষ প্রকাশ করে দিই তাহলে সেও আমার দোষ প্রকাশ করে দিবে। আর আমি যদি তার দোষ ঢেকে রাখি তাহলে সেও আমার দোষ গোপন রাখবে। এমনকি এর বদৌলতে আল্লাহও আমার এমন দোষ গোপন রাখবেন, যা প্রতিবেশীও জানে না। হাদীস শরীফেএসেছে, যে তার মুসলিম ভাইয়ের দোষ ঢেকে রাখে আল্লাহও কিয়ামতের দিন তার দোষঢেকে রাখবেন। (সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৫৮০)


মুসলিম ও আত্মীয় হিসেবে প্রতিবেশীর হক:

প্রতিবেশীর যত হক উপরে উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলো তো প্রতিবেশী মুসলিম হোক অমুসলিম হোক সবারই হক। আর প্রতিবেশী যদি মুসলিম হয় বা মুসলিম ও আত্মীয় উভয়টিই হয় তাহলে এসকল হকের সাথে মুসলিম ও আত্মীয় হিসেবে যত হক আছে সবই তাদের প্রাপ্য। এ বিষয়টিও স্মরণ রাখা জরুরি।

প্রতিবেশীর সঙ্গে সর্বদা সদ্ভাব বজায় রাখার জন্য রাসুল (সা.) তাঁর উম্মতের প্রতি জোর নির্দেশ দিয়েছেন। এমনকি এ ইঙ্গিতও দিয়েছেন যে, প্রতিবেশীর প্রতি যদি সুসম্পর্ক বজায় না থাকে, তা হলে তার অনেক ইবাদতই নষ্ট হয়ে যাবে। একজন ব্যক্তি যদি তার প্রতিবেশীর সঙ্গে অপ্রীতিকর সম্পর্ক রাখে, সে ব্যক্তিজীবনে যত ইবাদতই করুক না কেন, আল্লাহপাকের দরবারে তা কবুল হওয়ার নিশ্চয়তা নেই। তার ওপর প্রতিবেশীর সঙ্গে যদি শত্রুতার সম্পর্ক বিদ্যমান থাকে এবং প্রতিবেশী যদি তার ভয়ে, তার নিরাপত্তার আশঙ্কায় শঙ্কিত থাকে, তা হলে তার কোনো ইবাদতই আল্লাহর দরবারে কবুল তো হবেই না; অধিকন্তু পরকালে তার জন্য কঠিন দুঃসংবাদ প্রদত্ত আছে।

এ সম্পর্কে মুসলিমে আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘প্রতিবেশী যার অনিষ্ট থেকে নিরাপদ নয়, সে বেহেশতে যাবে না।’ হাদিসটির বিশেষিত অর্থে বলা যায়, প্রতিবেশীর সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপন এবং নির্ভরযোগ্য বন্ধুত্ব পরম মাবুদ আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের অন্যতম উপায়।

এমনিভাবে প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক এবং তার প্রতি কর্তব্য সম্পর্কে পবিত্র হাদিসে বহু বাণী বর্ণিত আছে। কিন্তু প্রতিবেশীর হকদারের কম-বেশির কথাও আছে। সেটা নির্ভর করে প্রতিবেশীর নৈকট্যের ওপর। দূরের প্রতিবেশীর চেয়ে কাছের প্রতিবেশীর অধিকার তুলনামূলকভাবে বেশি। যেমন অন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিবেশীর চেয়ে স্বদেশীয় প্রতিবেশীর হক বেশি। একই দেশের অন্য অঞ্চলের চেয়ে নিজ অঞ্চলের প্রতিবেশীর হক বেশি। অন্য গ্রাম বা মহল্লার চেয়ে নিজ গ্রাম বা মহল্লার প্রতিবেশীর হক বেশি। একই গ্রাম বা মহল্লার দূরের চেয়ে কাছের প্রতিবেশীর হক বেশি।

এ সম্পর্কে বোখারি শরিফে আয়েশা (রা.) কর্তৃক বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) কে জিজ্ঞেস করা হলো ‘আমার দুইজন প্রতিবেশী আছে, কাকে উপহার দেব?’ তিনি বললেন, ‘যার দরজা তোমার দরজার কাছে।’ এ কথার অর্থ এই যে, যে কোনো প্রতিবেশীই হোক না কেন, সবার প্রতি আমাদের নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য অবশ্যই আছে। কিন্তু নিকটতম প্রতিবেশীর প্রতি এ দায়িত্ব অধিকতর। একজন মানুষকে সুন্দর জীবনযাপনে সাহায্য করার জন্য যা কিছু প্রয়োজন, সে ব্যাপারে সার্বিক সহযোগিতা প্রদান প্রতিবেশীর একান্ত কর্তব্য। এক প্রতিবেশী যদি তার অন্য প্রতিবেশীর কাছ থেকে শান্তিপূর্ণ জীবনের সহমর্মিতা ও সহযোগিতামূলক নির্ভরতা পায়, তবেই প্রতিবেশী হিসেবে তার কর্তব্য পূরণ হয়ে যাবে।

প্রতিবেশী হিসেবে একে অন্যের প্রতি এ দায়িত্বগুলো যদি আমরা পালন করতে না পারি, তা হলে আমাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে অন্যায় ও অশান্তি প্রতিষ্ঠার কোনো কারণই থাকতে পারে না। বরং প্রতিষ্ঠিত হতে পারে সর্বজনীন নিরাপত্তাময় সুখী, সুন্দর ও শান্তিময় জীবন। তাই মুসলমান হিসেবে আমাদের সবার উচিত, পবিত্র হাদিসের আলোকে সুন্দর জীবন গঠনপূর্বক নিরাপত্তাময় সুখী সমাজ ও দেশ গঠনে ব্রতী হওয়া। একমাত্র এমনিভাবেই ব্যক্তি, সমাজ ও দেশের কল্যাণ আসতে পারে, অন্য কোনো মতবাদ অথবা পথে নয়।

তাই প্রতিবেশীদের ধর্ম, বর্ণ ও গোত্রের বিভেদ ভুলে তাদের সাহায্য-সহযোগিতায় এগিয়ে আসা আমাদের কর্তব্য। আল্লাহ আমাদের প্রতিবেশীদের প্রতি সদাচরণের তাওফিক দান করুন। আমীন।


প্রতিবেশী

মন্তব্য করুন-

বাংলাদেশর সকল জেলায় জেলা প্রতিনিধি, উপজেলা প্রতিনিধি, বিশেষ প্রতিনিধি ও বিজ্ঞাপন প্রতিনিধি পদে জরুরী ভিত্তিতে সাংবাদিক নিয়োগ চলছে। আগ্রহী প্রার্থীগণ নিন্মোক্ত ঠিকানায় যোগাযোগ করুন।

নাম: আহসান হাবিব সোহেল
মোবাইল: ০১৭১২২৩১৩৯০
ইমেইল: doinikvoreraloi@gmail.com